রিকশার প্যাডেলেই ঘোরে শিশু সৌরভের স্বপ্ন

ডেস্ক রিপোর্ট
দক্ষিণ বাংলা বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০
রিকশার প্যাডেলেই ঘোরে শিশু সৌরভের স্বপ্ন

সৌরভ বাবুর বয়স ১২ বছর। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে চলে তার পেট। যে সময় পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের পাতায় নিমগ্ন থাকার কথা, অবসরে পাড়ার ডানপিটে ছেলেদের সঙ্গে খোশগল্পে মত্ত কিংবা দুরন্তপনায় মেতে থাকার কথা, ঠিক সে সময় তার দু’পায়ের নিচে রিকশার প্যাডেল ঘুরছে!

শিশু সৌরভের বাড়ি দিনাজপুরের বিরামপুর পৌরশহরের ছোট যমুনা নদীর কোল ঘেষা মাহমুদপুর মহল্লায়। চিকিৎসার অভাবে মা হামিদা বেগমকে হারিয়েছে দু’বছর আগে। বাবা দুলাল হোসেন দ্বিতীয় বিয়ে করে আছেন অন্যত্র। একমাত্র বড় ভাই হামিদুল ইসলাম, তিনিও বিয়ে করে আলাদা সংসারে থাকেন। এতে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়ে শিশু সৌরভ বাবু।

সেই থেকে মা’হীন ঘরে সৌরভ একা হয়ে যায়। অবুঝ মনে আপনজনের অভাব তাকে বিচলিত করে তুলে। একদিকে পেটের ক্ষুধা, অন্যদিকে পড়ালেখা। পেটের চাহিদা মেটাতে শিক্ষার চাহিদায় ভাটা পড়ে। প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির সিঁড়িতে উঠলেও শেষ করা আর সম্ভব হয়নি।

সৌরভের প্রতিবেশীরা জানান, শাখা যমুনা নদীর কোল ঘেঁষে শিশু সৌরভের একমাত্র বাড়িটিও এখন বেদখল। সেই বাড়িতে এখন এক দূর সম্পর্কের মামা থাকেন। সেখানেই শর্তসাপেক্ষে আশ্রিত সে।

গত বুধবার (৯ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টা। শহরের পল্লবী সিনেমা মোড়ের সামনের সড়কে দাড়িঁয়ে থাকা এক ভদ্রলোকের নিকট সৌরভ জানতে চাইল, স্যার কোথায় যাবেন। ভদ্রলোক উত্তরে বললেন, তুমি ছোট ছেলে তোমার রিকশায় যাওয়া যাবে না।

সেখানে কথা হলো সৌরভের সঙ্গে। সৌরভ বলে, আমি ছোট বলে অনেক মানুষ আমার রিকশায় উঠতে চায় না। পঞ্চ শ্রেণিতে পড়ালেখা করে আর করতে পারিনি। থাকার, খাবার ঠিকানা নাই। এখন রিকশার প্যাডেলের সঙ্গেই ঘোরে আমার জীবনের স্বপ্ন।

সে আরও বলে, স্টেশন এলাকা একটি গ্যারেজ থেকে রিকশাটি ভাড়া নিই। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে আড়াই থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। দিন শেষে গ্যারেজ মালিককে ১৫০ টাকা রিকশা ভাড়া দিতে হয়। পকেটে যা থাকে তা দিয়েই হোটেলে দু’বেলা ভাতের বিল ও পকেটখরচ মিটাই।

সৌরভ বলে, মা-মারা যাবার পর থেকেই আমি একা হয়ে যাই। আমার মায়ের থাকার ঘরটি এখন আমার দূর সম্পর্কের মামা-মামির দখলে। যতদিন তাদেরকে খাবার খরচ বাবদ চাল ও টাকা দিতাম আমাকে ততদিন ভাত দিতো। টাকা ও চাল দেয়া বন্ধ হলে হলে আমার ভাতও বন্ধ হয়। এখন আমি তাদের সাথে থাকলেও সারাদিন শহরে রিকশা চালাই। হোটেলেই তিন বেলা খেয়ে শুধু রাতে ওই ঘরে গিয়ে ঘুমাই।

অভিমানের সুরে সৌরভ জানায়, আগে মা, বাবা, ভাই সবাই ছিল। কিন্তু কপাল দোষে মা মারা যাবার পর বাবা, ভাই ও সঙ্গে নিজের থাকার জায়গাটিও নেই। গরীবের দিকে কে চোখ তুলে তাকাবে বলেন?

সৌরভের মামা আব্দুর রহিম বলেন, সৌরভের বাবা-মা’র কোনো নিজস্ব জমি নেই। তারা যে বাড়িতে থাকতো সেটিও অন্যের জমির উপর তৈরি করা। সৌরভের থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব আমি নিতে চাইলেও সে রাজি হয়নি। সৌরভ তার নিজের মতো করে চলতে চায়।

সৌরভের বিষয়ে কথা হলে বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিমল কুমার সরকার বলেন, এমনিতেই শিশুশ্রম সরকার অবৈধ করেছে। তারপরও সৌরভ রিকশা চালায় এ বিষয়টি আমার জানা নেই। নিশ্চয় এটা অমানবিক। তার সম্পর্কে ভালো করে খোঁজখরব নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।


আরো নিউজ